মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

শয়তানের পরিচয় -মারেফতের বাণী / ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল-সুরেশ্বরী


মেজাজি শয়তানের পরিচয় ও ব্যাখ্যা আগেই দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা হাকিকি শয়তান তথা আসল শয়তানের পরিচয় ও ব্যাখ্যাসামান্য দিতে চাই। হাকিকি শয়তান তথা আসল শয়তান, পবিত্র কোরান অনুসারে, চার প্রকার : ইবলিশ, শয়তান, মরদুদ এবং খান্নাস। এই চার প্রকার শয়তানকে আল্লাহ্‌পাক মাত্র দুইটি স্থানে থাকবার অনুমতি দিয়েছেন। এই দুইটি স্থান ছাড়া এই চার প্রকার শয়তানকে আর কোথাও থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি, এমনকি আল্লাহ্‌র্‌ সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের আর কোথাও থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি। যে দুইটি নির্দিষ্ট স্থানে এই চারটি শয়তানকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেই স্থান দুইটির নাম হল : জিনের অন্তর এবং মানুষের অন-র। জিনের অন-র এবং মানুষের অন-র ছাড়া এক পা-ও বাহিরে যাবার ক্ষমতা শয়তানের নাই। সুতরাং জিনের অন-র এবং মানুষের অন-র ছাড়া এই চারটি শয়তানের থাকবার আর কোন বিন্দুমাত্র স্থান নাই। আকাশ হতে শয়তানেরা যে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে তথা ফেলতে থাকে, উহা পৃথিবীর আকাশ নয়, বরং প্রতিটি মানুষের মনের আকাশ। এই মনের আকাশ হতেই শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার তরে,দিশেহারা করার তরে, বিপথে নেবার তরে, অনবরত আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। চরম সত্যে মানুষের মনের আকাশে শয়তান যে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে, ইহা শয়তানের ডিউটি। মানুষটি দুনিয়াই চায়, না আল্লাহ্‌কে চায়, এই পরীক্ষা করার জন্যই এহেন আগুনের গোলা নিক্ষেপ করার কথাটি আসে। যদি পরীক্ষা করার প্রশ্নটি না থাকত তাহলে মনের আকাশে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করার প্রশ্নই উঠত না। সুতরাং শয়তান বাহিরে থাকে না, থাকবার বিধান নাই। দুধ আর মাখন যেভাবে দুধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, এবং দুধের মাঝে যে মাখন আছে ইহা বুঝবার উপায় থাকে না, সে রকম মানুষের অন্তরে যে শয়তান অবস্থান করছে ইহাও বুঝবার উপায় থাকে না। সুতরাং প্রতিটি মানুষ মনে করে যে সে একা, কিন্তু আসলে সে মোটেই একা নয়। যেহেতু প্রতিটি মানুষের সঙ্গে শয়তানকে পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে সেই হেতু মানুষ দুইজন, অনেকটা একের ভিতরে দুইয়ের মত। কিন্তু ইহাও সত্য নহে। কারণ জীবাত্মার সঙ্গে খান্নাসরূপী শয়তান পাশাপাশি অবস্থান করছে, সে রকমভাবে আরেকজন অবস্থান করছে। সেই আরেকজনের নাম হল রূহ তথা পরমাত্মা তথা স্বয়ং আল্লাহ্‌। তাই প্রতিটি মানুষের শাহারগের নিকটেই আল্লাহ্‌ আছেন বলে ঘোষণাটি দেখতে পাই। অন্য কোনো জীব-জানোয়ারের শাহারগের নিকটে আল্লাহ্‌র অবস্থানটির ঘোষণা কোরানে পাই না। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল যে, যেহেতু জিন নিয়ে আমাদের কোন কাজ কারবার নাই, তাই আমরা ইচ্ছা করেই জিন বিষয়টিকে বাদ দিলাম, যদিও জিন এবং মানুষকেই আল্লাহ্‌র ইবাদত করার কথাটি বলা হয়েছে। সমস্ত সৃষ্টিরাজ্য আল্লাহ্‌র ইবাদতে ডুবে আছে, তাই ইবাদত করার আদেশ দেবার প্রশ্নই আসে না। যেহেতু মানুষ এবং জিনকে সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে, সেহেতু ইবাদত করার উপদেশটি প্রযোজ্য। যখন শয়তান অহংকার করে তখন শয়তানের রূপটির নাম হল ইবলিস। বালাসা শব্দটির অর্থ হল অহংকার। ইহা হিব্রু ভাষা, আরবি ভাষা নয়। বালাসা তথা অহংকার শব্দটি বিশেষ্য তথা নাউন, ইবলিস তথা অহংকারী শব্দটি বিশেষণ তথা এডজেকটিভ, সুতরাং শয়তানের আদিরূপ ইবলিস তথা অহংকারী। কারণ আদমকে সেজদা দিবার হুকুমটি সরাসরি অমান্য করার দরুণ সে অহংকারী হয়ে গেল, তথা ইবলিস হয়ে গেল। তাই ইবলিসই হল শয়তানের প্রথম এবং আদিরূপ। মানুষ জীবনধারণের প্রশ্নে যখন বিভিন্ন প্রকার লোভ-লালসার খপ্পরে পড়ে যায় এবং জীবনধারণের প্রশ্নে বৈষয়িক বিষয়ের ঘাত-প্রতিঘাতের আঘাতে প্রতিনিয়ত জর্জরিত হতে থাকে, সেই আঘাত-খাওয়া অবস্থানটির নাম শয়তান। তাই পবিত্র কোরানের যে কোনো পবিত্র সূরা পাঠ করার আগে আমাদের বলতে হয় যে, পাথরের আঘাত-খাওয়া শয়তান হতে আশ্রয় চাই। হাজিরা যে শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারে সেই মেজাজি বিষয় হতেই হাকিকি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ বুঝতে পারে, কেউ পারে না। বোঝাটাও তকদির, না বোঝাটাও তকদির। সুতরাং চরম পর্যায়ে, আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মাঝে বিন্দুমাত্র ভুলের অবকাশ নাই। ইহাই পবিত্র কোরানের পবিত্র সূরা মুলকে বলা হয়েছে। কেউ বোঝেন, কেউ বোঝেন না। বোঝাটাও তকদির, না বোঝাটাও তকদির। তকদিরের বলয় হতে আল্লাহ্‌র বিশেষ রহমত ছাড়া বেরিয়ে আসা অসম্ভব। জিন এবং মানুষের অন-র ছাড়া শয়তানের অবস্থানটির কথা যদি অন্য কোথাও আছে বলে কেউ লিখে তো ধরে নিতে হবে যে, সে ইসলামের বিন্দু-বিসর্গও জানে না, কেবল হাউকাউ করে বড় বড় কথার ফুলঝুড়ি ছড়ায়ে, আরবি ব্যাকরণের তেলেসমাতি দেখিয়ে সরল মানুষগুলোকে লিখনির মাধ্যমে বিভ্রান্ত, দিশেহারা করে তুলছে। যে মানুষটি কেবলমাত্র দুনিয়াই চায় এবং যার দুনিয়া চাওয়া ছাড়া আর কোন চাওয়াই থাকে না, তাকে মরদুদ বলা হয়। মরদুদের স্থান হাবিয়া দোজখ। হাবিয়া দোজখের তলা থাকে না। যে মানুষটির দুনিয়া চাওয়ার সীমা থাকে না সেই মানুষটিকে তলা-ছাড়া হাবিয়া দোজখে যেতে হয়। এই মরদুদ শব্দটি পবিত্র কোরানে কয়েকবার পাওয়া যায়। যে শয়তান সর্ববিষয়ে সর্বঘটনায় পিছু পিছু কুমন্ত্রণা দিতে থাকে তার নাম খান্নাস। শয়তানের এই খান্নাসরূপটি ভয়ংকর এবং বিপদজনক। তাই খান্নাসের কুমন্ত্রণা হতে পবিত্র কোরান মুক্তি চাইবার উপদেশদিয়েছেন। অবাক লাগে যে, শয়তানের এই খান্নাসরূপটি এত ভয়ংকর অথচ সমগ্র কোরানে মাত্র একবার উল্লেখ করা হয়েছে। কাউসার শব্দটি এবং আহাদ শব্দটি সমগ্র কোরানে মাত্র একবার করে উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি খান্নাস শব্দটিও একবার উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এই তিনটি শব্দের মাঝে গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। এই তিনটি শব্দের অর্থ ব্যাকরণ দিয়ে মোটামুটি একটি ধারণা জন্মাতে পারে, কিন্তু গভীর রহস্য অনুধাবন করতে হলে হৃদয় দিয়ে গবেষণা করতে হয়। সুতরাং পরিশেষে আবার একই পুরোনো কথাটি বলতে চাই যে, জিন এবং মানুষের অন্তর ছাড়া শয়তানের থাকার আর একটি স্থানও নাই। এই খান্নাসরূপী শয়তানটি, যাহা প্রতিটি মানুষের অন-রে অবস্থান করছে, উহাকে তাড়িয়ে দেবার বহু প্রকার উপদেশের আরেক নাম পবিত্র কোরান। যত প্রকার মোরাকাবা, মোশাহেদা, ধ্যানসাধনা, এবাদত- বন্দেগি, কান্না ও বিলাপ, নফ্‌সকে ইচ্ছা করে নানা প্রকার কষ্ট দান করা, সবই এই খান্নাসরূপী শয়তানকে তাড়িয়ে দেবার একমাত্র উদ্দেশ্যে। আর দ্বিতীয় কোন উদ্দেশ্য নাই এবং থাকার কোন বিধান রাখা হয়নি। তাই পবিত্র কোরানের সূরা মোমিনের ষাট নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, হে মানুষ, তুমি একা হও এবং একা হয়ে আল্লাহ্‌কে ডাক দাও, তাহলে ডাকের জবাব সঙ্গে সঙ্গে পাবে। আরবি ভাষায় দুইজনে ডাক দিলে বলা হয় উদ্‌উনা, আর একজনে ডাক দিলে হয় উদ্‌উনি। কোরান উদ্‌উনি তথা একা শব্দটি ব্যবহার করেছে। উদ্‌উনা তথা দুইজন থাকলে ডাকের জবাব পাওয়া যাবে না। আমি এবং খান্নাসরূপী শয়তান মিলে দুইজন। কারণ খান্নাসরূপী শয়তান বাহিরে থাকে না, বরং আমার অন-রেই অবস্থান করছে। সুতরাং আমরা দুইজন। এই দুইজন থাকলে আল্লাহ্‌ ডাকের জবাব দেন না। এই দুইজনের অবস্থানটাকেই উদ্‌উনা বলা হয়। খান্নাসরূপী শয়তানকে তাড়াও এবং তাড়াতে পারলে তুমি একা হবে, এবং একা হলে ডাকের জবাব সঙ্গে সঙ্গে পাবে। ইমামুল আউলিয়া বায়েজিদ বোস্তামি (র.) জাবরুত মোকামের শেষ প্রানে- দাঁড়িয়ে বললেন, ‘রব (আল্লাহ্‌), আমি তোমার প্রতি  সন্তুষ্ট।' রব বললেন, ‘বায়েজিদ, তুমি মিথ্যুক। কেননা যদি তুমি সত্যিই সন-ুষ্ট থাকতে তাহলে সনু-ষ্ট থাকার কথাটি বলতে না।' বায়েজিদ লজ্জায় মাথা নত করে পুনরায় কঠোর ধ্যানসাধনায় মগ ড়ব রইলেন। এভাবে দুই বসর ধ্যানসাধনায় মগ ড়ব থাকার পর বায়েজিদ একদিন বলে ফেললেন, ‘আমিই সুবহানি, সব শান আমারই।' (‘আনা সুবহানি মাআজামু শানি।') লা মোকামে প্রবেশ করতে পারলেই এই রকম কথা বলা যায়। সুতরাং নাসুত, মালাকুত ও জাবরুত মোকামে সাধককে পীরের ধ্যানটি করতেই হবে এবং কোনো রহস্যজনক বিষয় দেখতে পেলে আপন পীরের রূপেই দেখা যায়। কিন্তু সাধক যখন লা মোকামে প্রবেশ করেন তখন দেখতে পান, আপন পীর ডান দিক দিয়ে চলে গেছেন এবং বাম দিক দিয়ে খান্নাসরূপী শয়তানটি ভেগে গেছে। তখনই সাধক নিজের মধ্যে দেখতে পান যে, তাঁর পীরও তিনি এবং তাঁর মুরিদও তিনি। এখানেই তৌহিদ। সুতরাং পীর ধরাও শেরেক, কিন্তু ইহাই শেষ শেরেক। সুতরাং আপন পীরের অবস্থানটি জাবরুত মোকাম পর্যন্ত। লাহুত মোকামে পীর আর থাকেন না। সুতরাং লাহুত মোকামে সাধক যখন প্রবেশ করেন তখন দেখতে পান যে, আপন পীরের আধ্যাত্মিক মূল্য এক টাকাও নয়। সুতরাং আপন পীরের অবস্থানটি তিনটি মোকাম পর্যন্ত। লাহুত মোকামে প্রবেশ করলেই পীর আর থাকেন না এবং পীরের দাম আর এক টাকাও নহে। এই কথাগুলো উঁচু স্তরের নীতিনির্ধারণের কথা। তাই অনেকের ভুল বোঝার সম্ভাবনাটি থেকে যায়। এখানে পীর ধরাটা মুখ্য বিষয় নহে, মুখ্য বিষয়টি হলো আল্লাহ্‌র তৌহিদ সাগরে অবগাহন করা।

-মারেফতের বাণী
চেরাগে জান শরীফ ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল-সুরেশ্বরী

1 টি মন্তব্য: